Friday, March 24, 2017

গাছভাই নাচভাইঃ শামীম হোসেন

গ্রন্থকথনঃ
নিমেষেই পড়ে শেষ করলাম কবি শামীম হোসেনের ছড়ার বই ‘গাছভাই নাচভাই’। দু’বার পড়ার পর আমার মনে হয়েছে তাঁর পুরো বইটাকে আমরা দুটো অধ্যায়ে বিভক্ত করতে পারি।
একভাগ প্রতিনিধিত্ব করবে ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ’৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রাম, জাতির পিতা শেখ মুজিব, তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল, এবং দিনশেষে নিজ জন্মভুমির সবুজ প্রকৃতির মাঝে ফিরে চাওয়া। অপরভাগে রয়েছে শৈশবের খেলাধুলা, বাবার প্রতি শিশুর আবদার, পাখি-বৃষ্টি-বনদস্যু আর চিরাচরিত ভূতমামা।

এবার তাহলে ১ম ভাগের মূল আলোচনায় আসা যাকঃ
ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২’র ফেব্রুয়ারিতে সালাম-বরকত-রফিক-জব্বার বাংলা ভাষার যে বীজ বপন করে গেছেন, কবি তা দেখেছেন এভাবে-
ফুলে ফুলে ভাসবে বেদিমূল
একুশ আমার বর্ণমালার ফুল,
একুশ এলে কৃষ্ণচূড়া লাল,
একুশ তবে ভাষার মহাকাল।
ভাষা আন্দোলন শেষে ২৪ বছর অপেক্ষার পর শুরু হয় পাকিস্তানের অধীনতা থেকে মুক্তির জন্য আমাদের মুক্তি সংগ্রাম, স্বাধীনতা সংগ্রাম, কবির ভাষায়-
সেই পাখিটি মানতে নারাজ
পরের অধীনতা
মুক্ত পাখি আকাশজুড়ে
শুধুই স্বাধীনতা।
স্বাধীনতা সংগ্রাম শেষ, কিন্তু যিনি না থাকলে আমাদের এই সংগ্রাম পূর্ণতা পেতনা, তিনি জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান। তাইতো কবি বলেছেন-
আকাশ বিশাল নীলের ছোঁয়ায়
গোলাপ ছড়ায় সৌরভ
টুঙ্গিপাড়ার একটি ছেলে
আমাদেরই গৌরব।
’৭৫র আগস্টে ঘাতকের বুলেট কেড়ে নিয়েছিল শেখ মুজিব এবং তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের প্রাণ। তাঁদেরই একজন শেখ রাসেল- জাতির জনকের কনিষ্ঠ পুত্র। কবি তাঁকে স্মরণ করেছেন এভাবে-
রাসেল তোমায় পড়ছে মনে আজ
বুকের ভেতর খুলছি এখন ভাঁজ
........................................
নদীর মত ফুলের মত তুমি
তোমার জন্য কাঁদে জন্মভূমি।
দিনশেষে কবিও অন্য সবার মত মিশে যেতে চেয়েছেন নিজ দেশের সবুজ প্রকৃতির মাঝে। তাঁর ভাষায়-
আমার ভেতর একটি দুটি তারা
জাগিয়ে রাখে সারা আকাশ পাড়া
আকাশ থেকে মাটির দিকে নামি
দেখি আমার সবুজ জন্মভূমি।
এবার ২য় ভাগের আলোচনাঃ
শিশুকালে আমরা নানান খেলায় মেতে থাকতাম, কবিও ছোট্ট সিজুর খেলা প্রসঙ্গে বলেছেন-
খেলার তালে আলমারিটায়
যেই দিয়েছে থাবা
হাত ভাঙেনি কাচ ভাঙেনি
নিজেই তখন হাবা।
খেলা শেষ, এখন ক্ষুধা পেয়েছে, চলুন খেয়ে নেয়া যাক। আর খাবার সময় যদি পিঁপড়া পিছু না নেয় তবে কি হয়!!
একহাতে নাও তরমুজটা
কানে ঝোলাও লিচু
অন্য হাতে ডালটা ধরো
পিঁপড়ে নেবে পিছু।
খেলা শেষ, খাওয়া শেষ, এদিকে ঈদও এসে গেছে। ঈদ উপলক্ষে কত আবদারই আমাদের থাকতো আমাদের প্রিয় বাবার প্রতি। সেই আবদার যদি এমন হয়, তবে-
এবার ঈদে নতুন জামা
সঙ্গে নেবো জুতো,
যা নিবো তাই দিতে হবে
নইলে দেবো গুঁতো।
ঈদ শেষ, বসন্ত এসেছে, গাছে গাছে পাখি ডাকছে, ফুল ফুটছে-
পাখি ডাকে গাছের ডালে
আমার বাড়ি কোণে
পাখি ডাকে নদীর ধারে
দুরের কোনো বনে।
পাখি ডাকছে, কিন্তু সেও আছে মহাচিন্তায়। বনদস্যুরা গাছ কেটে পুরো বন মরুভুমি বানাতে ব্যাস্ত। আর অন্য পশুগুলোও ভীতসন্ত্রস্ত। কিভাবে?
শেয়াল নাকি ভাবছে শুধু
হরিণ ভয়ে কাবু
বনের ভেতর উঠছে গড়ে
শিকারিদের তাবু।
সবই শেষ, আমার লেখাও। গাছ শেষ, প্রকৃতি শেষ, শেষ রুপকথার ভুতের ভয়ও। তবুও মানুষরুপী বনদস্যুদের দেখে ভূত দেখার মতই আমরা থতমত খেয়ে যাই। কবির ভাষায়-
ভূতের ছড়া ভূতের গল্প আছে ভূতের ভয়
ভূতকে নিয়ে মাতামাতি অনেক কিছু হয়
মানুষগুলো ভূতের মত দেখতে যদি হত
তোমরা সবাই হরহামেশা খেতে থতমত।
(আমি সাহিত্যের ছাত্র নই, সাহিত্য সম্পর্কে জ্ঞানও আমার যতসামান্য। চেষ্টা করেছি নিজ মতামতকে প্রাধান্য দিতে। তবে এটুকু বলতেই হয়, প্রকৃতি-শৈশব-গাছ-পাখি-বৃষ্টি-ভূত ইত্যাদির পাশাপাশি ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, শেখ মুজিব, শেখ রাসেল, স্বদেশপ্রেম ইত্যাদির সাথে যারা নিজ শিশু-কিশোরদের পরিচিত করাতে চান, তাঁদের জন্য এক আদর্শ সংগ্রহ হতে পারে ‘গাছভাই নাচভাই’।।)
মোঃ শাহীন হোসেন
বিবিএ মার্কেটিং, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়